গাইবান্ধা প্রতিনিধি: গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ৪ নম্বর জামালপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটকেন্দ্র নিয়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান ভোটকেন্দ্রটি বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন আরাজী জামালপুর গ্রামের ভোটাররা। অন্যদিকে, ভোটারদের যাতায়াতের দুর্ভোগ কমাতে চিকনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন করে একটি সাব-সেন্টার (উপকেন্দ্র) স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন চিকনি এলাকার বাসিন্দারা।

এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করতে ভোটকেন্দ্র এলাকা পরিদর্শন করেছেন রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলওয়ার হোসেন, জেলা অতিরিক্ত নির্বাচন কর্মকর্তা শাহীনুল আলম ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শাহারিয়ার প্রামাণিক। এ সময় জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদ হাসান শুভ, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্যসহ স্থানীয় ভোটার ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ১৭ আগস্ট গাইবান্ধা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলামও সরেজমিনে ভোটকেন্দ্র এলাকা পরিদর্শন করেন।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলওয়ার হোসেন স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে একটি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। তবে ওয়ার্ডের চিকনি এলাকায় বসবাসকারী ভোটাররা সেখানে নতুন একটি সাব-সেন্টার স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে এসে কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। কেন্দ্রটির অবকাঠামোগত বিষয় দেখা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলে তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে, চিকনি এলাকায় নতুন সাব-সেন্টার স্থাপনের দাবি ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে আরাজী জামালপুর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এর প্রতিবাদে গত মঙ্গলবার দুপুরে আরাজী জামালপুর এলাকার পাকা সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় ভোটাররা।
তাদের দাবি, আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান ভোটকেন্দ্রটি আরাজী জামালপুর, চিকনি ও বড় জামালপুর কুটিপাড়ার আংশিক এলাকার ভোটারদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ কেন্দ্রে প্রায় ২ হাজার ৬০৯ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। তাই কেন্দ্রটি বিভক্ত করে চিকনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন উপকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি মহল নিজেদের স্বার্থে বর্তমান ভোটকেন্দ্রটি বিভক্ত করার চেষ্টা করছে।

তবে চিকনি এলাকার ভোটারদের দাবি, তারা বর্তমান ভোটকেন্দ্রটি সরিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন না। বরং চিকনি এলাকায় বসবাসরত ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুবিধার্থে সেখানে একটি সাব-সেন্টার স্থাপনের দাবি জানাচ্ছেন তারা। এ দাবিতে ইতোমধ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদন ও স্মারকলিপি দিয়েছেন এলাকাবাসী।
আবেদনে বলা হয়েছে, আরাজী জামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্র থেকে চিকনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। ভোটারদের অনেককে গ্রামীণ কাঁচা ও নর্দমাযুক্ত রাস্তা দিয়ে কেন্দ্রে যাতায়াত করতে হয়। এতে বিশেষ করে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, নারী ও গর্ভবতী ভোটারদের ভোট দিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
চিকনি এলাকার বাসিন্দাদের পক্ষে কেন্দ্র স্থাপনের আবেদনকারী মো. সেলিম সরকার মানিক বলেন, বড় জামালপুর কুটিপাড়া ও আরাজী—এই দুই এলাকার মোট ভোটার প্রায় ১ হাজার ২৫৪ জন। বিপরীতে শুধু চিকনি এলাকাতেই ভোটার রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৩৫৫ জন। ভোটার সংখ্যা ও যাতায়াতের দূরত্ব বিবেচনায় চিকনিতে একটি সাব-সেন্টার স্থাপন করা হলে এলাকার বিপুলসংখ্যক ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ আরও সহজ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হবে।

তিনি আরও বলেন, চিকনি এলাকায় সাব-সেন্টার স্থাপনের দাবিতে এর আগেও উপজেলা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সম্প্রতি জেলা নির্বাচন অফিস ও রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সরেজমিনে এলাকা ও সম্ভাব্য কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এ সময় স্থানীয় ভোটারদের দুর্ভোগ ও বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা অবগত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সেলিম সরকার মানিক অভিযোগ করে বলেন, ভোটারদের সুবিধার জন্য সাব-সেন্টারের দাবি জানানো হলেও জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহিদ হাসান শুভ এতে বাধা দিচ্ছেন। তার দাবি, চেয়ারম্যান নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন এবং স্থানীয়দের ভুল বুঝিয়ে সাব-সেন্টার স্থাপনের দাবি নস্যাৎ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহিদ হাসান শুভ। তদন্তের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘জামালপুর ইউনিয়নে নয়টি ওয়ার্ড রয়েছে। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও ভোটার হিসেবে কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ নেই। স্থানীয় এলাকাবাসীসহ যারা কেন্দ্রের দাবি করছেন, তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করতে চেয়েছিলাম। তাদের আলোচনায় বসার জন্য ডাকলেও সাড়া পাইনি।’
চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘একটি মহল ভোটকেন্দ্র স্থানান্তরের চেষ্টা করছে। অথচ অতীতে চিকনি এলাকার ভোটাররা আরাজী জামালপুর কেন্দ্রেই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিয়েছেন।’
বর্তমানে একদিকে চিকনি এলাকার বাসিন্দারা নতুন সাব-সেন্টার স্থাপনের দাবি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে আরাজী জামালপুর গ্রামের ভোটাররা বর্তমান ভোটকেন্দ্র বহাল রাখার দাবি করছেন। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবিতে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিষয়টির দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে যেকোনো সময় দুই এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

এ অবস্থায় ভোটারদের সুবিধা, যাতায়াতের দূরত্ব, কেন্দ্রের অবকাঠামো, স্থানীয় বাস্তবতা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টির দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন জামালপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা।
Leave a Reply